হযরত উসমান (রা.) এর যে দানে এখনও উপকৃত হচ্ছে মানুষ

1512

হযরত উসমান (রা.) এর যে দানে- ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে ওয়াকফ মূলত এমন সম্পত্তি যা সাধারণভাবে সকল মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

এই সম্পত্তি কুক্ষিগত করে কেউ ব্যক্তিগত ভাবে পুঁজি অর্জন ও ভোগ করতে পারবে না। এই সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত অর্থ শুধু দাতব্য কাজেই ব্যবহার করা যাবে।

মদীনায় মুসলমানদের হিজরতের সময় মদীনাবাসীর পান করার মত পানির যথাযথ কোন উৎস ছিল না। শুধু একটি পানির কূপ ছিল যার পানি সকলে পান করতো। তবে সেটি ছিল এক ইহুদির দখলে এবং সে এই পানির জন্য চড়া মূল্য রাখতো।

হযরত উসমান (রা.) তখন কূপের মালিকের কাছে কূপটি কেনার প্রস্তাব দেন যাতে করে মদীনাবাসী বিনামূল্যে কূপটির পানি ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু ইহুদি এই প্রস্তাব প্রত্যাখান করে। ফলে হযরত উসমান (রা.) তার থেকে কূপটি ভাড়া নেওয়ার প্রস্তাব দেন। ইহুদি তাকে প্রতি একদিন পর দ্বিতীয় দিনে কূপটি ভাড়া দিতে সম্মত হয়।

হযরত উসমান (রা.) তার নির্ধারিত দিনে সকলের জন্য বিনামূল্যে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। ফলে হযরত উসমান (রা.) এর ভাড়া করা দিনে মদীনাবাসী তাদের প্রয়োজনীয় পানির সংস্থান করে নিত। অন্য দিকে ইহুদির জন্য নির্ধারিত দিনে কেউই তার কাছ থেকে পানি নিতে আসতো না।

এতে ইহুদি বাধ্য হয়ে হযরত উসমান (রা.) এর কাছে কূপটি বিক্রি করে দেয়। হযরত উসমান (রা.) বিশ হাজার দিরহামে কূপটি কিনে নিয়ে মদীনাবাসীর জন্য ওয়াকফ করে দেন। সেই থেকে এখন পর্যন্ত চৌদ্দশো বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু এখনও এই কূপটি অভাবী-দরিদ্র মানুষের কল্যাণে এবং হাজীদের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।

বর্তমানে কূপটির চারপাশে কূপের পানি ব্যবহার করে বিশাল এক খেজুর বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। সউদি আরবের কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই বাগানটি তত্ত্বাবধান করা হয়। বাগানের খেজুর বিক্রয় থেকে যা আয় হয়, তা সমান দুই ভাগ করে এক ভাগ এতিম ও দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করে দেওয়া হয়।

অপর ভাগ হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) এর নামে এক বিশেষ ব্যাংক একাউন্টে জমা করা হয়। সউদি ওয়াকফ মন্ত্রণালয় এই বিষয়টি তত্ত্বাবধান করে। এই টাকা হজ্জ্বযাত্রীদের সুবিধার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থাপনার কাজসহ অন্যান্য দাতব্য কাজে ব্যবহার করা হয়।

মানব কল্যাণে একনিষ্ঠ দানকে মহান আল্লাহ এভাবে ওমর করে রাখেন। ব্যক্তি পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু তার দান ও অন্যান্য ভালো কাজ তার ও পৃথিবীবাসীর মাঝে সম্পর্কের সেতু হয়ে তাঁকে মানুষের মাঝে বাঁচিয়ে রাখে। এই কাজগুলো তাকে পরপারে ধনী করতে থাকে।

রাব্বুল আমাদের প্রত্যেককে যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী সেবা মূলক কাজে ভূমিকা রাখার তাওফিক দান করুন। আমীন।

লোক দেখানো দানকারীর জন্য পবিত্র কোরআনের হুঁশিয়ারি

আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত চলছে বড় হবার প্রতিযোগিতা। বড় হওয়ার লক্ষ্য কিন্তু খারাপ নয়। তবে লক্ষ্য রাখা উচিত যে, নিজেকে বড় করতে গিয়ে যেন কাউকে ছোট না করা হয়। সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে কে কাকে সহায়তা করছে। কাউকে সহায়তা করা অবশ্যই ভালো কাজ।

কিন্তু ছবি তুলে কিংবা ভিডিও করে বিভিন্ন পত্রিকা, টেলিভিশনে প্রচার করাটা মোটেও ঠিক বলে মনে হয় না। প্রচার করার কারণে যে ব্যাক্তি সহায়তা করছে সে সমাজের উচ্চ স্থানে যাচ্ছে, কিন্তু সেই অসহায় মানুষগুলো নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।

সমাজের চোখে এই হতদরিদ্র সাধারণ মানুষগুলোকে নিচু জাতের মনে করে অবহেলা করা হয়। কেননা আশেপাশের লোকের কাছে তারা পরিচিতি লাভ করে নিকৃষ্ট লোক হিসেবেই। একটু সহায়তা নিয়ে তারা গোটা জাতির কাছে ছোট হচ্ছে। রাস্তা দিয়ে চলতে গেলে লোকেরা তাদের নিয়ে কানাঘুঁষা করে। লোকজন বলাবলি করে, ওই লোকটাকে টিভিতে দেখলাম না সেদিন হাত পেতে চাল, ডাল, জামা, ইত্যাদি সহায়তা নিতে।

এই কথাগুলো যখন সেই অসহায় মানুষটি শুনতে পায় তখন তার কষ্ট হয়। তারা মনে মনে ভাবতে থাকে, আল্লাহ তাদের কেনো দরিদ্র বানালেন। যারা অসহায় মানুষকে সহায়তার নামে নিজের প্রচার করে বেড়াচ্ছে, তারা যদি একবার সেই অসহায় মানুষদের কাতারে দাঁড়িয়ে কারো কাছ থেকে হাত পেতে কিছু নিতো তাহলে, হয়তো সহায়তা করে ঢাক-ডোল পিটিয়ে প্রচার করতে পারতো না।

যে ব্যাক্তি সহায়তা করে তা প্রচার করে বেড়াচ্ছে সে কিন্তু সমাজের চোখে একজন ভালো মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হচ্ছে। কিন্তু যাদেরকে সে সহায়তা করেছে তাদের সমাজের চোখে ছোট করে তুলছে। একটু ভালো কাজ করে তা প্রচার সুনাম অর্জন করতে চাওয়াটাকে লোক দেখানো ভালো কাজ হিসেবেই ভেবে নিবো।

কেউ যদি ভালো কাজ করে তাহলে তার ফল সে পাবেই। লোক দেখানো ভালো কাজ না করে সত্যিকারের কিছু করাটাই যুক্তিযুক্ত বলে মনে করি। পবিত্র কোরআনে লোক দেখানো ভালো কাজ যারা করে, তাদের জন্য জাহান্নামের হুমকি দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘ওই সব ধার্মিকদের জন্য জাহান্নাম অনিবার্য, যারা তাদের ধর্ম সম্পর্কে উদাসীন।

আর তারা যখন কোনো ভালো কাজ করে, তা লোক দেখানোর জন্য করে। এমনকি তারা স্বার্থ ছাড়া ছোট-খাটো জিনিসও মানুষকে দেয় না।’ সূরা মাউন, আয়াত ৪-৭।

কাউকে সহায়তা করলে তা প্রচার না করাই ভালো। হাদিসে বলা হয়েছে, এমনভাবে দান করো, যেনো ডান হাতের দান বাম হাত না জানে। যে স্বার্থ ছাড়া ভালো কাজ করে যাবে কোনো একদিন তার করা ভালো কাজগুলো আপনা-আপনি লোকমুখে প্রচার হবেই। আল্লাহ আমাদের বোঝার তাওফিক দিন। আমিন।