লিবিয়ার গেম ঘরের ‘চাবি’ মাদারীপুরে

1520

কুমিল্লার বাসিন্দা শরীফ হোসেনকে এলাকায় কেউ চেনেন না। তবে ঢাকা থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরত্বের দেশ লিবিয়ার বেনগাজি শহরে তার একটা প্রভাব রয়েছে।লিবিয়ায় অবস্থান করা বাংলাদেশি লোকজন তাকে সমীহ করেন।

কারণ, তিনি সেখানে ‘মাফিয়া শরীফ’ নামে পরিচিত। এই শরীফ সেখানে ‘গেম ঘরের’ মালিক।

দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে শরীফ চক্র লোকজনকে লিবিয়া নিয়ে গেম ঘরে আটকে রেখে নির্যাতন চালায়।

অবশ্য বেনগাজি শহরের সেই গেম ঘরের ‘চাবি’ থাকে দেশের মাদারীপুর জেলার বাসিন্দা তাজনাহার রিক্তা নামে এক নারীর কাছে। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) মানব পাচারের একটি মামলা তদন্ত করতে গিয়ে এই তথ্য পেয়েছে।

সিটিটিসির ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার তৌহিদুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে অবৈধপথে ইউরোপ নেওয়ার কথা বলে লিবিয়ার গেম ঘরে আটকে রাখার চক্রগুলোর মধ্যে শরীফ হোসেন অন্যতম।

তাকে বেনগাজিতে সবাই মাফিয়া হিসেবে চেনে। মাদারীপুর, শরীয়তপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এই চক্র ছড়িয়ে রয়েছে। এদের নারী সদস্যও রয়েছে।

এই কর্মকর্তা বলেন, শরীফ ও রিক্তা চক্রের মোবাইল ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন ব্যাংকে শতাধিক অ্যাকাউন্টের তথ্য মিলেছে। এর মধ্যে ৭০টি অ্যাকাউন্ট তারা যাচাই করে দেখেছেন।

এতে দেখা গেছে, এই অ্যাকাউন্টগুলোতে গত দুই বছরে অন্তত ৫ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজনকে লিবিয়ায় পাচার, সেখানে গেম ঘরে আটকে এবং জিম্মি নাটক সাজিয়ে ভিকটিম পরিবারগুলো থেকে এই টাকা আদায় করে শরীফ চক্র।

সিটিটিসির অন্য একজন কর্মকর্তা বলেন, লিবিয়ায় মাফিয়া শরীফের গেম ঘরে কয়েক মাস ধরে তিন শতাধিক লোক বন্দি অবস্থায় আছে। তাদের ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি নেওয়ার কথা বলে সেখানে নিয়ে আটকে রাখা হয়েছে।

তবে অবৈধ অভিবাসী অনুপ্রবেশে দেশটির নৌ সীমান্তে কড়াকড়ির কারণে কেউ যেতে পারছেন না। এ অবস্থায় শরীফ নানা জিম্মি নাটক সাজিয়ে বাংলাদেশে তাদের পরিবারের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন।

ওই কর্মকর্তা বলেন, গেম ঘরে আটকে থাকা লোকদের খাওয়ার খরচও তাদের স্বজনরা বাংলাদেশ থেকে পাঠিয়ে থাকেন। মাসে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা খাওয়া খরচ হিসেবে শরীফের লোকদের হাতে তুলে দিতে হচ্ছে।

দুই স্ত্রীকে নিয়ে নভেম্বরে দেশ ছাড়েন শরীফ

ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, গত নভেম্বরে শরীফ দেশেই ছিলেন। তার বিষয়ে তথ্য পেয়ে তাকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগও নেওয়া হয়। তবে ৩০ নভেম্বর দুই স্ত্রী সুমি আক্তার এবং হালিমা বেগমকে নিয়ে তিনি দেশ ছাড়েন।

এর পরই রিক্তা শরীফের হয়ে দেশে সমন্বয়কের দায়িত্ব পান। তবে শরীফের পুরো পরিবার, তার শ্বশুরপক্ষের লোকজনও এই পাচার চক্রে জড়িত। এরই মধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে চক্রের কার্যক্রম নিয়ে বেশকিছু তথ্য মিলেছে।

এই কর্মকর্তা বলেন, শরীফের বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবি শাখায় তারা চিঠি লিখবেন, যাতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাকে দেশে ফেরানো যায়। তার গেম ঘরে থাকা বন্দিদের কীভাবে মুক্ত করা যায়, সে বিষয়েও পরামর্শ করা হবে।

যে রুটে পাচার

সিটিটিসি কর্মকর্তারা বলছেন, শরীফ চক্রের দালালরা তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে। এই দালালরা ইউরোপ যেতে ইচ্ছুক লোকজনকে খুঁজে বের করে। এরপর তাদের কাছ থেকে প্রথম দফায় ৩ থেকে ৪ লাখ করে টাকা নেওয়া হয়।

প্রলোভন দেখানো হয় যে, এক সপ্তাহের মধ্যে বৈধভাবে বড় জাহাজে করে ইতালি পাঠানো হবে। এরপর ইউরোপ যেতে ইচ্ছুক লোকজনকে প্রথমে বৈধভাবে (ভ্রমণ ভিসায়) দুবাই, মিশর বা তুরস্ক পাঠানো হয়। এসব দেশেও শরীফের চক্রের লোকজন রয়েছে।

তারা বাংলাদেশ থেকে পাঠানো লোকজনকে রিসিভ করে নিজেদের কাছে রাখে। এরপর সুযোগ মতো লিবিয়ার বেনগাজিতে পাঠানো হয়। সেখানে শরীফ ও তার দুই স্ত্রীসহ তাদের মাফিয়া চক্রের লোকজন রিসিভ করে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে নেয়। এরপর শুরু হয় গেম ঘরের খেলা।

অবশ্য সিটিটিসির কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম জানান, তাদের কাছে তথ্য রয়েছে, নভেম্বরে শরীফ দুই স্ত্রীকে নিয়ে লিবিয়ায় নিজের ডেরায় চলে গেলেও প্রথম স্ত্রী হালিমা বেগম সেখানে মারা যান।

শরীফ তার পরিবারের কাছে দাবি করেছেন, হালিমা স্টোক করে মারা গেছেন। তবে তাকে মেরে ফেলা হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। শরীফকে দেশে ফেরাতে পারলে এসব প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার হবে।

জিম্মি, অপহরণ-উদ্ধার নাটকে হাতিয়ে নেওয়া টাকা

শরীফ চক্রের স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে গেছেন, বর্তমানে লিবিয়াতে শরীফের গেম ঘরে রয়েছেন—এমন অন্তত ছয়জনের পরিবারের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের।

তাদের মধ্যে শরীয়তপুর জেলার বাসিন্দা সোহরাব হোসেন গেম ঘর থেকে লিবিয়া যাওয়ার পথে নৌকাডুবির পর আন্তর্জাতিক শরণার্থী সংস্থার মাধ্যমে উদ্ধার হয়ে দেশে ফেরেন।

তিনি কালবেলাকে বলেন, তারা স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে প্রথমে ৪ লাখ টাকায় লিবিয়া যান। সেখানে তাদের একটি বাসায় রাখা হলেও কয়েকদিন পর জাহাজে তুলে দেওয়ার কথা বলে সমুদ্রের অদূরে একটি গুদামঘরের মতো বাসায় নেওয়া হয় তাকে সহ কয়েকজনকে।

সেখানে তার মতো আরও কয়েকজনকে দেখতে পান। এটিই গেম ঘর নামে পরিচিত। এখান থেকেই সাগরে ছোট ছোট বোটে তুলে দেওয়া হয়, তাকেও একইভাবে তুলে দেওয়া হয়েছিল। যদিও তাকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় যে, বড় জাহাজে করে তাকে ইতালি নেওয়া হবে। সেই কথা বলে তার পরিবারের কাছ থেকে আরও ৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়। তবে স্থানীয় দালাল চক্রটি তার এলাকায় প্রভাবশালী হওয়ায় তিনি নাম বলতে রাজি হননি।

শরীফের গেম ঘরে জিম্মি অবস্থা থেকে উদ্ধার হয়ে বিভিন্ন সময়ে দেশে ফেরা লোকজন পুলিশকে বলেছে, তাদের বাসা থেকে গেম ঘরে নেওয়ার সময়ে লিবিয়ার স্থানীয় পুলিশ বা দেশটির সন্ত্রাসী চক্র তুলে নিয়ে যায়। অনেককে গেম ঘর থেকেও তুলে নেওয়া হয়।

এরপর শরীফ ও তার লোকজন দেশে থাকা দালালদের মাধ্যমে তা পরিবার ও স্বজনদের জানিয়ে দেন এবং তাদের মুক্ত করতে ৫ থেকে ৮ লাখ টাকা দাবি করেন। শরীফের স্ত্রী সুমি ও তার স্বজন রিক্তার কাছে সেই টাকা তুলে দিতেই তারা জিম্মিদশা থেকে মুক্ত হয়ে যান! আসলে এটা শরীফের টাকা আদায়ের একটা কৌশলমাত্র।

মাদারীপুরের শিবচরের একজন বাসিন্দা রহিম শেখ গত জুলাইয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি পৌঁছতে পেরেছেন। তিনি কথোপকথনের অ্যাপস ইমুতে কয়েকদিন আগে এই প্রতিবেদককে বলেন, তাকে এক সপ্তাহের মধ্যে বড় জাহাজে ইতালি নেওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু তিনি ছয় মাস লিবিয়ায় থাকেন। এর মধ্যে মাফিয়াদের হাতে একবার জিম্মি হন। কিন্তু নিজের এলাকায় টাকা দেওয়ার পর মুক্ত হন। যদিও তার জিম্মি বা অপহরণ হওয়ার বিষয়টি পরিবারকে তিনি জানাতে পারেনি। যারা জিম্মি করে, অপহরণ করে তারাই তা পরিবারকে বলে ভয় দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়। এটা বেনগাজিতে ওপেন সিক্রেট।

মুন্সীগঞ্জের নুরুজ্জামান রাজু ১০ মাস ধরে লিবিয়ায় শরীফের গেম ঘরে বন্দি। তাকে ছাড়াতে মাফিয়া শরীফের স্থানীয় এজেন্টেরা রাজুর পরিবারের কাছ থেকে এ পর্যন্ত ১৫ লাখ টাকা নিয়েছে। তবে রাজু বেঁচে আছে কিনা, তা তারা জানেন না।

গতকাল শুক্রবার রাজুর মা নুরজাহান বেগম কাঁদতে কাঁদতে ফোনে কালবেলাকে বলেন, ছেলেকে অপহরণ করা হয়েছে, আবার কখনো বড় জাহাজে ইতালি নিয়ে যাবে বলে তাদের কাছ থেকে বারবার টাকা নেওয়া হচ্ছে। কুমিল্লার শরীফের লোক ভৈরবের বিল্লাল এ পর্যন্ত ১৫ লাখ টাকা নিয়েছে। কিন্তু ছেলের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা বলে যে, সে মাফিয়াদের কাছে আছে। এখন ছেলে বেঁচে আছে কিনা, তাও জানেন না।

লেনদেন ইতালিতে, হুন্ডি হয়ে আসে দেশে

সিটিটিসির ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগের কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ইতালিতেও মাফিয়া শরীফের একটা সিন্ডিকেট রয়েছে। তারা অবৈধভাবে ইউরোপে লোক পাঠিয়ে অন্তত ৫ কোটি টাকা পাচারের তথ্য পেলেও এর বাইরে বড় অঙ্কের টাকার লেনদেন হয় ইতালিতে। পরে সেই টাকা হুন্ডির মাধ্যমে আসে দেশে।

এই কর্মকর্তা বলেন, তারা শরীফ চক্রকে নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত শুরু করেছেন। মানব পাচার, হুন্ডিসহ নানা তথ্য পাচ্ছেন তারা।