সাইন বোর্ড সাঁটিয়ে ভুয়া সনদ বিক্রি করে কোটি টাকার মালিক স্বামী-স্ত্রী

109

ভুয়া সনদ বিক্রি করে কোটি টাকার- ডজন খানেক ভুয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে শিক্ষার্থী ও চাকরি প্রত্যাশীদের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বগুড়ার বহুল আলোচিত আল ফারাবি মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী আকলিমা খাতুনকে ঢাকার শান্তিবাগ থেকে গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় গ্রেফতার করা হয়েছে।

প্রতারণার শিকার একাধিক ব্যক্তির অভিযোগের পর তাদের গ্রেফতার করে সিআইডি পুলিশ। পুলিশ জানায়, গ্রেফতারকৃত দম্পতির পুঁজি কেবল একটি বহুতল ভবনের দুটি ফ্লোর। সেখানে সাইন বোর্ড সাঁটিয়ে অন্তত ১১টি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের আড়ালে সার্টিফিকেট বাণিজ্য করে আসছিলেন তারা। এটা করেই গত তিন বছরে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন স্বামী-স্ত্রী।

এখন পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংকের হিসাব নম্বরে সাড়ে সাত কোটি টাকা জমা হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে তাদের। তাদের দু’জনের বাড়িই বগুড়ার ঝোপগাড়ির বড় কুমিরায়। সিআইডির একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, ফারাবি ও তার স্ত্রী আকলিমা বগুড়ার সদর থানার কলেজ রোডের সাধারণ বীমা ভবনের পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলায় বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সাইন বোর্ড ঝুলিয়ে দেন।

এর মধ্যে রয়েছে নুরুল ইসলাম ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি, নিয়াক মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং ইন্সটিটিউট, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, বগুড়া টিএইচবিপিইডি কলেজ, এসবি সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি কলেজ, পাবলিক হেলথ ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্ক, শহীদ মোনায়েম হোসেন বিএড কলেজ, নুরুল ইসলাম আকলিমা প্যারামেডিকেল ইনস্টিটিউট, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড বিএম কলেজ ও রংপুর একাডেমিক অ্যান্ড প্রফেশনালস ইনস্টিটিউট।

অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্তে নামে পুলিশের অপরাধ বিভাগ সিআইডি ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সিআইডির সূত্রে জানা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ফারাবি ও তার স্ত্রী চারুকলা ডিপ্লোমা সার্টিফিকেট বিক্রি করেই সবচেয়ে বেশি অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। এছাড়া অনেক চাকরি প্রত্যাশীকে প্রলোভনের ফাঁদে ফেলতেন তারা। বিভিন্ন উচ্চ বিদ্যালয়ে চাকরি দেওয়ার কথা বলে অনেক বেকার শিক্ষার্থীকে তাদের নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করানো হতো। এ ছাড়া ভর্তি হলে পাস করানো হবে, এই নিশ্চয়তাও দিতেন তারা।

সিআইডির একজন কর্মকর্তা জানান, গণমাধ্যমে তারা নিজ প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ব্যাপারে বিজ্ঞাপন দিতেন। সেখানে বলা হতো, তাদের চারুকলা ডিপ্লোমা কোর্স জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন রয়েছে। এই ধরনের একটি বিজ্ঞপ্তি নজরে আসার পর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক কেন্দ্রের পক্ষ থেকে ফারাবি ও তার স্ত্রীর নামে মামলা করা হয়েছিল।

তদন্তে উঠে এসেছে, শতশত শিক্ষার্থী ফারাবি ও তার স্ত্রীর প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়ে ভুয়া সার্টিফিকেট পেয়েছেন। অনেকে আবার জেনে-শুনেই তাদের কাছ থেকে সার্টিফিকেট কিনতেন। চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে এখন পর্যন্ত ৪৩৬ জনকে এ ধরনের নকল সার্টিফিকেট সরবরাহ করেছেন তারা। একেকটি সার্টিফিকেট ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকায় বিক্রি করতেন।

সিআইডি বলছে, ফারাবি ও তার স্ত্রীর নামে-বেনামে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের অনুসন্ধান করে এখন পর্যন্ত বেশকিছু তথ্য তাদের হাতে এসেছে। বগুড়ার বিভিন্ন ব্যাংকে নামে-বেনামে হিসাব নম্বর খুলেছেন তারা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় ফারাবি ও তার স্ত্রীর নামে এসব হিসাব নম্বরে সাত কোটি ৩১ লাখ ৫৮ হাজার ৫০০ টাকা পাওয়া গেছে।

বগুড়ায় তাদের দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া বগুড়ায় ফারাবি ও তার স্ত্রীর নামে ৪০ বিঘা জমি থাকার তথ্যও মিলেছে। দুদক জানায়, নুরুল ইসলামের নামে রুপালী ব্যাংক বগুড়া কর্পোরেট শাখায় ৯০ লাখ টাকা, তার স্ত্রী আকলিমার নামে উত্তরা ব্যাংক বগুড়া শাখায় ৪৫ লাখ টাকা, তাদের তিন সন্তান আতিক রনক ও ফাতিমার নামে বগুড়ার রুপালী ব্যাংক কর্পোরেট শাখায় ৯০ লাখ টাকা, আইএফআইসি ব্যাংকের বগুড়া শাখায় তার শ্যালিকা নাজমিন আক্কারের নামে ৩ কোটি টাকার সন্ধান পাওয়া গেছে। এই টাকাগুলো তারা জালিয়াতির মাধ্যমে সনদ বিক্রি করে আয় করেছেন।

সিআইডির ইকোনোমিক ক্রাইম স্কোয়ার্ডের ইন্সপেক্টর ইব্রাহিম হোসেন জানিয়েছেন, অনুসন্ধানের পর এসব ব্যাংক হিসেবের তথ্য পাওয়ার পর রবিবার নুরুল ইসলাম, তার স্ত্রী আকলিমা খাতু ও শ্যালিকা নাজমিন আক্কারকে আসামি করে বগুড়া সদর থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে তিনি বাদী হয়ে এই মামলা করেছেন।

সূত্র- দৈনিক ইত্তেফাক।