মহানবী (সা.) আমাদের সন্তানকে প্রথমেই যা শেখাতে বলেছেন

1302

শিশুর জন্য শিক্ষা- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশু সন্তানতে প্রথমে কালেমা শিক্ষা দেয়ার নসিহত পেশ করেছেন। কোমল হৃদয়ে তাওহিদের কালেমা শেখাতে পারলেই শিশুর জন্য তা হবে সার্থক ও সফল।

শিশুকে কথা বলা শেখানোর দায়িত্ব কিংবা শিশুর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সময় যিনি অতিবাহিত করার বিষয়টি দেখাশুনা করেন প্রত্যেক শিশু সন্তানের মা। এ কারণেই নেপোলিয়ান বলেছিলেন- ‘আমাকে একজন ভালো ‘মা’ দাও, আমি তোমাদের একটি ভালো জাতি উপহার দেবো।’

নেপোলিয়ানের চিন্তা দর্শনের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন বিখ্যাত কবি আব্দুর রহমান আল -কাশগারি রহমাতুল্লাহি আলাইহি। তিনি প্রত্যেক মাকে শি’শুর পাঠশালা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘হিজনুল উম্মাহাতি হিয়া আল মাদরাসাতু লিল বানিনা ওয়াল বানাত’ অর্থাৎ ‘মায়ের কোল বালক-বালিকাদের জন্য পাঠশালা স্বরূপ।’

শিশুদের চিন্তা-চেতনার বিকাশ সাধনে মা এর ভূমিকা অত্যধিক। কেননা শিশুরা মা এর সঙ্গেই বড় হয়। শিশুর সুশিক্ষা ও আত্মবিশ্বাসও অর্জিত হয় মা এর কাছে। তাইতো প্লেটো বলেছেন- ‘মা-এর শিক্ষাই শিশুর সুন্দর ভবিষ্যতের বুনিয়াদ।’

সুতরাং শি’শুকে উত্তম শিক্ষা দেয়া প্রতিটি মানুষের একান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা কোরআনুল কারিমে নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘হে ঈ’মানদারগণ! তোম’রা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবারকে জাহান্নামের আ’গুন থেকে বাঁ’চাও।’

পরিবারের লোকদের এমন শিক্ষা দাও। যাতে সে অন্যায় পথে ধাবিত না হয়। ইসলামের সুমহান সত্য ও সুন্দরের সঙ্গে সন্তানকে গড়ে তোলা ঈ’মানের দাবি। শিশুকে কথা বলা শেখাতে হাদিসের উপদেশ হলো এমন-

হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা নিজ নিজ শিশুকে সর্বপ্রথম কথা শিখাবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।’ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।’ (বায়হাকি, মুস্তাদরেকে হাকেম)

দুনিয়ার সব শিশুর কথা বলা শুরু হোক কালেমা পাঠের মাধ্যমে। আর তাতে শিশুর জন্য বয়ে আনবে কল্যাণ ও বরকত। এর মাধ্যমেই শিশু হবে বিশুদ্ধ হৃদয়ের অধিকারী।

মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহকে তাদের শিশু-সন্তানের কোরআন-হাদিসের দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী উত্তম জীবন ব্যবস্থায় বড় করে গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন। কালেমার মাধ্যমে কথা বলা শুরু করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

সবাই মুখ ফিরিয়ে নিলেও ঘোর বিপদে মহান আল্লাহ পাক ফিরিয়ে নিবেন না…

আল্লাহ পাকের কোনো শরিক নেই, তিনি কাউকে জন্ম দেননি, কারও থেকে জন্ম নেননি। তার সমকক্ষ কেউ নেই, তিনি চিরঞ্জীব এবং চিরস্থায়ী। এই বিশাল পৃথিবী, চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহ, বৃক্ষলতা, মানব-দানব, পশু-পাখি, সাগর-পাহাড় সবকিছু তিনি সৃষ্টি করেছেন।

সৃষ্টি জগতের সবাইকে আল্লাহর ওপর ঈমান আনতে হয়। মুসলমান হিসেবে আমাদের কর্তব্য হলো- আল্লাহ তায়ালার একত্বকে মুখে স্বীকার করা এবং অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করা। তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এটা মনেপ্রাণে ধারণ করা।

কোরআন-হাদিসের শিক্ষা মতে ঈমানের দাবি হলো- সবকিছুকে বর্জন করে শুধু আল্লাহর প্রতি দৃঢ় প্রত্যয় স্থাপন করা, তাকে ভালোবাসা, ভয় করা। প্রয়োজনে শুধু আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা, সর্বাবস্থায় তার ওপর ভরসা রাখা।

সেই সঙ্গে সর্বদা মনে রাখা, একদিন তার কাছে সবাইকে ফিরে যেতে হবে এবং ভালো বা মন্দ পরিণতি তার ফয়সালার ওপর নির্ভরশীল। ঈমানদাররা কিয়ামতের দিন মহান প্রভু আল্লাহ তায়ালার দিদার লাভ করে ধন্য হবেন।

এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনিই একমাত্র আল্লাহ। তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনি দৃশ্য-অদৃশ্য এবং উপস্থিত-অনুপস্থিত সব বিষয়ে পূর্ণ জ্ঞান রাখেন। -সূরা হাশর: ২২।

অন্যত্র বলা হয়েছে, তিনি সেই আল্লাহ যিনি আসমান ও জমিন এবং এর মধ্যবর্তী স্থানের সব কিছুর সৃষ্টিকারী। তিনি আলিমুল গায়েব। তিনি সব জায়গায় বিরাজমান। তিনি প্রকাশ্য-অ’প্রকাশ্য সব কিছুই দেখেন ও খবর রাখেন।

এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহ সকল দৃশ্য-অদৃশ্য ও উপস্থিত অনুপস্থিত সকল বিষয়ে পুরোপুরি জ্ঞাত। মহান আল্লাহই সব প্রাণীর রিজিকদাতা। কোনো সৃষ্টিকেই তিনি রিজিক থেকে বঞ্চিত করেন না।

সকল প্রাণী সৃষ্টির পূর্বেই তিনি তাদের রিজিকের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। সব প্রাণীকেই তিনি রিজিক দেন এবং প্রতিপালন করেন। মহান আল্লাহ তায়ালা ক্ষমাশীল। অন্যায় বা ভুল করার তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে তিনি ক্ষমা করে দেন। কাউকে তিনি ফিরিয়ে দেন না। পবিত্র কোরআন মজিদে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ গাফুরুর রাহিম। আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল।’ – সূরা আলে ইমরান: ৩১

আল্লাহ তায়ালা এমনই এক সত্তা যার কাছে কোনো কিছু প্রার্থনা করে কেউ বিফল হয় না। মানুষের যা কিছু প্রয়োজন, তা আল্লাহর নিকটই প্রার্থনা করা প্রয়োজন। পবিত্র কোরআনে এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন কোনো প্রার্থনাকারী আমা’র কাছে প্রার্থনা করে তখন আমি তার প্রার্থনা কবুল করি।’ – সূ‍রা আল বাকারা: ১৩৬

আল্লাহ বলতে আম’রা শুধু অদ্বিতীয় এক সত্তাকে বুঝি। যাকে দেখা যায় না। কিন্তু বিপদে ডাকলে তিনি সাড়া দেন। ঘোর বিপদে যখন কেউ সাহায্য করার ক্ষমতা রাখে না- তখনও তিনি সাহায্য করেন।

দশম হিজরির ৯ জিলহজ, শুক্রবার দুপুরের পর হজের সময় আরাফা ময়দানে হযরত মুহাম্মদ (সা:) লক্ষাধিক সাহাবার সমাবেশে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। হামদ ও সানার পর তিনি বলেন , ‘হে মানুষ! তোমরা আমার কথা শোনো।

এরপর এই স্থানে তোমাদের সঙ্গে আর একত্রিত হতে পারবো কি না, জানি না। হে মানুষ! আল্লাহ বলেন, হে মানব জাতি! তোমাদেরকে আমি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে সমাজ ও গোত্রে ভাগ করে দিয়েছি যেন তোম’রা পরস্পরের পরিচয় জানতে পারো’।

অ’তএব শুনে রাখো, মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই। আরবের ওপর কোনো অনারবের, অনারবের ওপর কোনো আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তেমনি সাদার ওপর কালোর বা কালোর ওপর সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে বেশি সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী, যে আল্লাহকে ভালোবাসে। হে মানুষ! শুনে রাখো, অন্ধকার যুগের সকল বিষয় ও প্রথা আজ থেকে বিলুপ্ত হলো। জাহিলি যুগের রক্তের দাবিও রহিত করা হলো।

হে মানুষ! শুনে রাখো, অপরাধের দায়িত্ব কেবল অপরাধীর ওপরই বর্তায়। পিতা তার পুত্রের জন্য আর পুত্র তার পিতার অপরাধের জন্য দায়ী নয়। হে মানুষ! তোমাদের র’ক্ত, তোমাদের সম্মান, তোমাদের সম্পদ পরস্পরের জন্যে চিরস্থায়ী ভাবে হারাম (অর্থাৎ পবিত্র ও নিরাপদ) করা হলো, যেমন আজকের এই দিন, আজকের এই মাস, এই শহরের সকলের জন্যে হারাম।

হে মানুষ! তোমরা ঈর্ষা ও হিংসা- বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকবে। ঈর্ষা ও হিংসা মানুষের সকল সৎ গুণকে ধ্বং’স করে। হে মানুষ! নারীদের সম্পর্কে আমি তোমাদের সর্তক করে দিচ্ছি। তাদের সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করো না। তাদের ওপর যেমন তোমাদের অধিকার রয়েছে, তেমনি তোমাদের ওপর তাদেরও অধিকার রয়েছে। সুতরাং তাদের কল্যাণের দিকে সব সময় খেয়াল রেখো।

হে মানুষ! অধীনস্থদের সম্পর্কে সতর্ক হও। তোমরা নিজেরা যা খাবে তাদেরও তা খাওয়াবে। নিজেরা যা পরবে, তাদেরও তা পরাবে। শ্রমিকের শরীরের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি পরিশোধ করবে।

যে মানুষ! বিশ্বাসী সেই ব্যক্তি যার হাতে ও মুখ থেকে অন্যের সম্মান, ধন ও প্রাণ নিরাপদ। সে নিজের জন্যে যা পছন্দ করে অন্যের জন্যেও তা-ই পছন্দ করে। হে মানুষ! বিশ্বাসীরা পরস্পরের ভাই। সাবধান! তোমরা একজন আরেকজনকে হ’ত্যা করার মতো কুফরি কাজে লিপ্ত হয়ো না।

হে মানুষ! শুনে রাখো, আজ হতে বংশগত শ্রেষ্ঠত্ব বা কৌলিন্য প্রথা বিলুপ্ত করা হলো। কুলীন বা শ্রেষ্ঠ সে-ই যে বিশ্বাসী ও মানুষের উপকার করে। হে মানুষ! ঋণ অবশ্যই ফেরত দিতে হবে। বিশ্বস্ততার সাথে প্রত্যেকের আমানত রক্ষা করতে হবে। কারো সম্পত্তি- সে যদি স্বেচ্ছায় না দেয়, তবে তা অপর কারো জন্যে হালাল নয়। তোমরা কেউ দুর্বলের ওপর অবিচার করো না।

হে মানুষ! জ্ঞানীর কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও মূল্যবান। জ্ঞানার্জন প্রত্যেক নর-নারীর জন্য ফরজ। কারণ জ্ঞান মানুষকে সঠিক পথ দেখায়। জ্ঞান অর্জনের জন্যে প্রয়োজনে তোম’রা চীনে যাও। হে মানুষ! তোম’রা তোমাদের প্রভুর ইবাদত করবে।

নামাজ কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে,রোজা রাখবে, হজ করবে আর সঙ্গবদ্ধভাবে নেতাকে অনুসরণ করবে; তাহলে তোমরা জান্নাতে দাখিল হতে পারবে।

হে মানুষ! শুনে রাখো, একজন কুশ্রী কদাকার ব্যক্তিও যদি তোমাদের নেতা মনোনীত হয়, যতদিন পর্যন্ত সে আল্লাহর কিতাব অনুসারে তোমাদের পরিচালিত করবে, ততদিন পর্যন্ত তাঁর আনুগত্য করা তোমাদের অবশ্য কর্তব্য।

হে মানুষ! শুনে রাখো, আমা’র পর আর কোন নবী নেই। হে মানুষ! আমি তোমাদের কাছে দুটো আলোকবর্তিকা রেখে যাচ্ছি। যতদিন তোম’রা এ দুটোকে অনুসরণ করবে, ততদিন তোম’রা সত্য পথে থাকবে। এর একটি আল্লাহর কিতাব। দ্বিতীয়টি হলো আমার জীবন-দৃষ্টান্ত।

হে মানুষ! তোমরা কখনোই ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না। কেননা অতীতে বহু জাতি ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ির কারণে ধ্বং’স হয়ে গেছে। হে মানুষ! প্রত্যেকেই শেষ বিচারের দিনে সকল কাজের হিসেব দিতে হবে। অতএব সাবধান হও! হে মানুষ! তোমরা যারা এখানে হাজির আছো, আমার! এ বাণীকে সবার কাছে পৌঁছে দিও।’ (এরপর তিনি জনতার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করলেন)

‘হে মানুষ! আমি কি তোমাদের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিয়েছি ? সকলে সমস্বরে জবাব দিলোঃ হ্যাঁ! এরপর নবীজি (সা:) বললেন, হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাকো! আমি আমার সকল দায়িত্ব পালন করেছি!