ভ্যান চালিয়ে ছেলেকে পুলিশ কনস্টেবল বানালেন মা !

197

ছেলেকে পুলিশ কনস্টেবল বানালেন মা- একবুক আশা নিয়ে নড়াইল পুলিশ লাইনস মিলনায়তনে অপেক্ষমান চাকরিপ্রার্থী তরুণ-তরুণীরা নিয়োগ পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল ঘোষণার পর পরই আনন্দে কেঁদে ফেললেন।

নির্বাচিতদের মধ্যে পিতৃহীন হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান হিসেবে সাকিবুর রহমানের কাছে এ চাকরি যেন পৃথিবীটাই হাতের মুঠোয় পাওয়ার মতো ঘটনা। এছাড়া সুপ্তিকণাসহ অনেকেরই অনুভূতি এমনটাই।

জেলা সদরের বরাশুলা গ্রামের প্রয়াত সেকেন্দার আলীর ছেলে কনস্টেবল পদে চাকরিপ্রাপ্ত সাকিবুর রহমানের মা সাবিনা ইয়াসমিন ভ্যান চালিয়ে বাড়ি বাড়ি এবং হাটবাজারে সবজি বিক্রি করে তিন সন্তানসহ চার সদস্যের সংসার চালান। সাকিবুর এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন।

অন্য দুই ভাইবোনের মধ্যে একজন দ্বাদশ শ্রেণিতে, অপরজন সপ্তম শ্রেণিতে পড়াশোনা করেন। সরকারি জমিতে খুপরি ঘরে তাদের বসবাস। ভ্যানচালক বাবা সেকেন্দার আলী প্রায় তিন বছর আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

এরপর তাদের পরিবারের সদস্যরা খেয়ে না-খেয়ে বেঁচে আছেন। সেই থেকে অসহায় পরিবারটির হাল ধরেন মা সাবিনা ইয়াসমিন। তিনি ভ্যানে করে ফেরি করে সবজি বিক্রি করে যে আয় করতেন, সামান্য টাকায় চলত তার সংসার। চরম অনটনের মধ্যেও লেখাপড়া চালিয়ে গেছেন সাকিবুর।

পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি পাওয়ার পর চোখে আনন্দ অশ্রু নিয়ে সাকিবুর জানান, ‘আমাদের খুব অভাব-অনটনের সংসার। এভাবে যে চাকরিটা পাবো, কল্পনাই করিনি।

কোনো প্রকার ঘুষ ও তদবির ছাড়াই কনস্টেবল পদে চাকরি পাওয়ার কথা জানালেন সাকিবুর।

তিনি বলেন, নিয়োগ পরীক্ষার ‘ফি’ বাবদ ব্যাংকে ট্রেজারি চালানের ১০০ টাকা ব্যতীত একটি টাকাও কোথাও খরচ করতে হয়নি।

শুধু সাকিবুর নয়, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি পেয়েছেন সুপ্তিকণা বিশ্বাসও। সে নড়াইল শহরের রূপগঞ্জ বাজারে রুটির দোকানি সমির বিশ্বাসের মেয়ে। তার বাড়ি সদর পৌরসভার বেতবাড়িয়া গ্রামে।

সুপ্তিকণা বিশ্বাস জানান, ‘বাবার নিকট থেকে টাকা নিয়ে ট্রেজারি চালান ফরম সংগ্রহ করে সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারি খাতে ১০০ টাকা জমা করি। এর পর গত ২৯ জুন শারীরিক পরীক্ষার দিনে পুলিশ লাইনসে গিয়ে দাঁড়িয়ে প্রথম স্তরে সফলতা পাই।

‘এরপর লিখিত পরীক্ষা এবং মৌখিক পরীক্ষা শেষে আমি চাকরির জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হই। আমার ইচ্ছে ছিল পুলিশে চাকরি করবো, সেটি পূরণ হয়েছে। যেভাবে স্বচ্ছ পদ্ধতির মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, এজন্য পুলিশ বিভাগের প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’

এছাড়া মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে এবার নড়াইল জেলায় পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি পেলেন ২০ জন। এর মধ্যে ৬ জন নারী ও ১৪ জন পুরুষ নির্বাচিত হয়েছেন।

গত ২৯ জুন থেকে নড়াইলে কনস্টেবল নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গত ৪ জুলাই সমাপ্ত হওয়া বাছাইপর্বে টিকে থাকা ৬২৪ জনের মধ্যে অবশেষে ২০ জন চাকরি পেলেন।

নির্বাচিতদের মধ্যে নড়াইল সদরের শিমুলিয়া গ্রামের ফাতেমা, মাইজপাড়া ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের হাসিবুল ইসলাম হাসিব, লোহাগড়া উপজেলার ছত্রহাজারী গ্রামের আনিয়া খাতুন, মঙ্গলহাটার মাহফুজ শেখসহ অনেক গরিব পরিবারের যোগ্য ও মেধাবী ছেলে-মেয়ের চাকরি হয়েছে।

ফলাফল ঘোষণার পর নির্বাচিত ২০ জন ও তাদের অভিভাবকদের ফুলেল শুভেচ্ছা এবং মিষ্টিমুখ করান পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন।

ফলাফল ঘোষণার সময় উপস্থিত ছিলেন যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সালাউদ্দিন, খুলনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নূরে আলম, নড়াইলের পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতির সভাপতি নাহিদা আক্তার চৌধুরী সুমিসহ পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা।