বৃদ্ধ মা-বাবাকে বেশিদিন বাঁচিয়ে রাখতে সময় দিন

79

ছোটবেলায় যেই ছেলেটি মাকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারতো না, সেই ছেলেটির এখন অফিসের ব্যস্ততায় ছয় মাসে একদিন মায়ের কাছে যাওয়ার সময় হয়না। আর বাবা ফোন দিলে কথা বলারও সময় হয়না। তাড়াহুড়ো করে কয়েকটি কথা বলে ফোন রেখে দিতে হয়। কিন্তু, চিরকাল তো তারা থাকবেন না!

বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রতিটি সন্তানের মনেই থাকে। আর সেজন্যই হয়তো তাদের দীর্ঘায়ু এবং সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করেন সবাই। তবে বার্ধক্যে বাবা-মাকে একটু ভালো রাখতে পারবেন কিন্তু আপনিই।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষকরা জানিয়েছেন, বার্ধক্যে একাকীত্বের কারণে মানুষ দ্রুত অসুস্থ হয় মৃত্যুর কাছাকাছি চলে যায়। ১৬০০ জনের উপর গবেষণা করে তারা দেখেছেন যে একাকীত্বের কারণে সময়ের আগে মৃত্যুর হার বাড়ে ২৩%।

দেখা গেছে যারা বুড়ো বয়সে একা ছিলেন, গবেষণা চলাকালীন সময়ে তারা অন্যদের তুলনায় গড়ে ৬ বছর আগে মৃত্যু বরণ করেছেন।

ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের বৃদ্ধদের স্বাস্থ্য ও পরিচর্যা সংক্রান্ত বিভাগের সিনিয়র কর্মী বারবারা মস্কোউইটজ বলেন, ‘আমাদের জীবনে এমন মানুষ প্রয়োজন যারা আমাদের মূল্য দেন, বোঝেন, ভালোবাসেন, আনন্দ দেন। অভিভাবকরা বার্ধক্যেও সন্তান এবং নাতি-নাতনিদের জন্য অনেক বড় অবলম্বন।’

বর্তমান সময়ে পরিবারগুলো ছোট ছোট ভাগে স্বাধীন জীবন যাপন করছেন। ফলে বাবা-মায়ের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়ে যাচ্ছে। বার্ধক্যের একাকীত্ব মেনে নিতে হচ্ছে অভিভাবকদের।

অথচ তাদের সঙ্গে সময় কাটালে, তাদের গল্প শুনলে, অভিজ্ঞতা জানলে সমৃদ্ধ হয় পরিবার। সেই সঙ্গে তাদের আলিঙ্গন আর মজার সব রেসিপিতে কেটে যায় মানসিক চাপ। সেই সঙ্গে বার্ধক্যে একাকীত্বে ভুগতে হয়না বলে বাবা-মাও ভালো থাকেন জীবনের শেষ দিনগুলোতে।

সন্তানের অসহায়ত্বের সময় যেভাবে মা-বাবা তাদের স্নেহভরে লালন-পালন করেছিলেন। তেমনি মা-বাবার বৃদ্ধাবস্থায় সন্তানরা তাদের সব চাহিদা পূরণ করবে। এমনটিই ইসলামের বিধান। নবীজির কাছে এক লোক এসে প্রশ্ন করলেন, আমার কাছ থেকে সবচেয়ে ভালো আচরণ পাওয়ার অধিকার কার? নবীজি (স.) বললেন, তোমার মায়ের। লোকটি আবার প্রশ্ন করলে তিনি একই উত্তর দেন। তিন-তিনবার এমন উত্তর দেওয়ার পর লোকটি আবার একই প্রশ্ন করে। নবীজি (স.) বলেন, তোমার পিতার। (বুখারি: ২২২৭)

একদা প্রিয় নবী (স.) এর কাছে এক বদ্ধ এলেন। উপবিষ্টরা তাঁকে জায়গা করে দিতে একটু দেরি করলেন। দেরি করাটা প্রিয় নবীর পছন্দ হয়নি। নবীজি (স.) সাহাবিদের কঠোর ভাষায় বললেন, ‘যে শিশুদের ভালোবাসে না এবং প্রবীণদের সম্মান করে না, সে আমার উম্মত নয়। (তিরমিজি: ১৯১৯)

মহান আল্লাহ বলেন, আমি তো মানুষকে তার মা-বাবার সঙ্গে ভালো আচরণের নির্দেশ দিয়েছি। জননী সন্তানকে কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে গর্ভে ধারণ করে এবং তার দুধ ছাড়ানো হয় দুবছরে। সুতরাং আমার প্রতি ও তোমার মা-বাবর প্রতি কৃতজ্ঞ হও। প্রত্যাবর্তন তো আমারই নিকট। (সুরা লুকমান: ১৪)

অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর ও কোন কিছুকে তাঁর শরিক করবে না এবং মা-বাবার, আত্মীয়-স্বজন, এতিম-মিসকিন,কাছের-দূরের প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথি, মুসাফির ও নিজের দাস-দাসীর সঙ্গে উত্তম আচরণ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন না দাম্ভিক-অহংকারীকে। (সুরা আন-নিসা: ৩৪)

আমি মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি, পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যহার করতে। (আনকাবুত: ৮)
আরেক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমি মানুষকে তার মাতা-পিতার সঙ্গে উত্তম ব্যবহারের আদেশ দিয়েছি। তার জননী তাকে গর্ভে ধারণ করে কষ্টের সঙ্গে এবং প্রসব করে কষ্টের সঙ্গে। তাকে গর্ভে ধারণ করতে ও দুধ ছড়াতে সময় লাগে ত্রিশ মাস। (সুরা আহকাফ: ১৫) ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) এরশাদ করেন, মাতা-পিতার রাজি-খুশির মধ্যেই আল্লাহর রাজি-খুশি। মাতা-পিতার অসন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহর অসন্তুষ্টি। (তিরমিজি: ২/১২)